Home / জাতীয় / গ্রাহকের ১৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তা!

গ্রাহকের ১৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তা!

অনলাইন নিউজ ডেস্ক

পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা তিনি। বেসরকারি ঢাকা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার। গোলাম সাঈদ রাশেব নামের এই ব্যাংক কর্মকর্তা পালিয়ে গেছেন গ্রাহকের ১৫ কোটি টাকা নিয়ে। ঘটসাটি গত বৃহস্পতিবারের হলেও ৩ দিন ছুটির পর সোমবার ব্যাংক খুললে বিষয়টি জানাজানি হয়। এ ঘটনায় সৃষ্টি হয়েছে তোলপাড়।

জানা যায়, ঢাকা ব্যাংক ফেনী শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার গোলাম সাঈদ রাশেব গ্রাহকের এ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ও ধার-কর্জের নামে অন্তত ১৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। টানা তিনদিন ব্যাংক বন্ধ থাকার পর বিষয়টি জানাজানি হলে সোমবার ব্যাংকে ভিড় জমায় গ্রাহকেরা। অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রাশেব ফেনী সদর উপজেলার মৌটবী ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের মৃত আজিজুল হক ভূঞার ছেলে।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, তাদের খোয়া যাওয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংক ম্যানেজার জানান, এখনও টাকার পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। অ্যাকাউন্ট লেনদেনের মাধ্যমে ৩-৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হতে পারে। তবে অনেকের সাথে ব্যক্তিগত লেনদেনও ছিল রাশেবের।

জানা যায়, রাশেব দীর্ঘদিন ধরে ফেনী ব্রাঞ্চে কর্মরত থাকায় গ্রাহকদের সাথে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সুবাদে অনেক গ্রাহকের চেকবই, পিন নাম্বার তার কাছে থাকতো। গ্রাহকের টাকা লেনদেন করতে করতে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে সে।

ডা. পলাশ নামে ঢাকা ব্যাংকের এক গ্রাহক বলেন, সোনাগাজী উপজেলার বক্তারমুন্সি এলাকার গ্রাহক ইকবাল হোসেনের চেক নিয়ে বাহক হিসেবে ২ লাখ টাকা উত্তোলন করতে কয়েকদিন আগে ব্যাংকে আসেন তিনি। এসময় ব্যাংক কর্মকর্তা রাশেব তাকে চা খাইয়ে ৮০ হাজার টাকা ধার চেয়ে বসে। কোনো রকম পূর্ব পরিচয় না থাকার পরও টাকা ধার চাওয়ায় পলাশের সন্দেহ হয়। এরপর টাকা না দিয়ে তিনি কৌশলে ব্যাংক ত্যাগ করেন।

ভূক্তভোগী গ্রাহকরা আরো জানান, বিশ্বস্ততার সুযোগ নিয়ে চতুর ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম সাঈদ রাশেব অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ সমন্বয়ের কথা বলে নিজে ও অন্য অফিসারদের দিয়ে সাদা (ব্লাংক) চেক সংগ্রহ করে। এ নিয়ে কয়েকজন গ্রাহকের সাথে মনোমালিন্য হলে গত ১২ মার্চ মঙ্গলবার ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার উর্ধ্বতনদের লিখিতভাবে বিষয়টি অবগত করেন।

পরদিন যথারিতি অফিসে এসে বিষয়টি জেনে সকাল সাড়ে দশটার দিকে ব্যাংক থেকে সরে পড়েন ওই কর্মকর্তা। ওই দিন চেক উত্তোলনের ম্যাসেজ পেয়ে দু’ একজন গ্রাহক ব্যাংকে অভিযোগ করলে বিষয়টি আরো জানাজানি হয়।

ফেনী শহরের শহীদুল্লা কায়সার সড়কের বাসিন্দা শহীদ উল্যাহ জানান, তার অ্যাকাউন্ট থেকে ৩৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও তার ভাই এরশাদ উল্যাহর অ্যাকাউন্ট থেকে ২১ লাখ টাকা, মহিপাল চৌধুরী বাড়ির বাবুল চৌধুরীর স্ত্রীর এফডিআর এর ৪৫ লাখ টাকা, সৌদি প্রবাসী দাউদ হোসেনের ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা, পলাশের ৪২ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে নেয় অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাশেব।

এছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তা রাশেব শহরের বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী অজয় কুমার বণিকের ঋণ সমন্বয় থেকে ৭০ লাখ টাকা, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাচ্চুটি গ্রামের মোশাররফ হোসেন মজুমদারের ৮ লাখ টাকা উত্তোলন করে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর গ্রামের মাহবুবুল হক রিপনের অ্যাকাউন্ট থেকে খোয়া গেছে ৩৪ লাখ টাকা। তিনি অভিযোগ করেন, তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরাধনা এন্টারপ্রাইজের অধীনে ব্যাংকের এই শাখায় ৫ কোটি টাকার ঋণ চলমান রয়েছে। ঋণ সমন্বয়ের কথা বলে দুটি সাদা (ব্লাংক) চেক নেন চতুর ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম সাঈদ রাশেব। পরে অ্যাকাউন্ট চেক করে দেখা যায় এই দুইটি চেক ব্যবহার করে টাকাগুলো উত্তোলন করেন রাশেব।

এছাড়া তার ছোটভাই ফজলুল হক পলাশের মুনতাসির এন্টারপ্রাইজ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ৪২ লাখ টাকা একই কায়দায় তুলে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মাহবুবুল হক রিপন বলেন, সরলতার সুযোগ নিয়ে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় রাশেব। তিনিসহ ব্যাংকের উপস্থিত অন্য গ্রাহকরা ঠিক কতজন গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন এমন তথ্য দিতে না পারলেও ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ হতে পারে বলে ধারণা করছেন।

ঢাকা ব্যাংক ফেনী শাখার ম্যানেজার মোঃ আকতার হোসাইন সরকার জানান, এ বছরের জানুয়ারি থেকে এ সকল অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত রাশেব। গত ১৩ মার্চ সে ব্যাংক থেকে গা ঢাকা দেয়ায় গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের ব্যাপারটি নজরে আসে। সে মানুষদের সাথে তিনভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট হ্যাকড করে, ব্যক্তিগতভাবে ধার-কর্জের নামে এবং গ্রাহকদের অনুমতি নিয়ে।

তিনি আরো বলেন, ঠিক কতটি অ্যাকাউন্ট থেকে মোট কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বা আত্মসাৎ করা হয়েছে এটি বলা মুশকিল। গ্রাহকরা মৌখিক ও লিখিতভাবে জানাচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রধান কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত দল (অডিট টিম) ফেনী শাখায় এসে কাজ শুরু করেছেন। অভিযুক্ত রাশেবের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকা থেকে আইটি এক্সপার্ট আসছেন। তাদের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে। প্রধান কার্যালয়ের সাথে সার্বক্ষণিক কথা বলে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান। ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন কোনো গ্রাহকের টাকা বেহাত হবে না। তাদের টাকা ফেরত দেয়া হবে।

এদিকে টাকা নিয়ে রাশেব উধাও হওয়ার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে তার স্ত্রী ফেনী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করেন। জিডিতে রাশেব নিখোঁজ বলে উল্লেখ করা হয়। অপরদিকে ব্যাংকের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে।

One comment

আপনার মতামত লিখুন

আপনার ‘ই-মেইল’ ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না, কিন্তু স্টার চিহিৃত ঘরগুলো পূরণ করতেই হবেতেই হবে *

*